ইতিহাসের আয়নায় ই-লার্নিং | লার্ন উইথ নাসিমূল

ইতিহাসের আয়নায় ই-লার্নিং

প্রযুক্তি বদলে দিচ্ছে পৃথিবী। যাপিত জীবনের নানা অভ্যাস, কাজকর্মে প্রযুক্তির ব্যবহার আমাদের অভ্যস্ত যাপনকে বদলে দিচ্ছে। বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ব্যবস্থায়ও ব্যপক পরিবর্তন এনেছে এই প্রযুক্তি। জ্ঞান বইয়ের পাতা থেকে এখন গুগল, ইউটিউবে। পকেটে রাখা স্মার্টফোনে পৃথিবীর বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম! হ্যা, শিক্ষাকে প্রযুক্তির সাথে ব্লেন্ড করে তা অনলাইনে সরবরাহের যে ধারনা একটু একটু করে বেড়ে উঠেছে, সেটাকেই আমরা ই-লার্নিং বা ইন্টারনেট লার্নিং বলছি। পকেটেই থাকছেন পৃথিবীর বিখ্যাত সব প্রশিক্ষক !

ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরাসরি ক্লাস করা কিংবা কোনো বিষয়ের উপর জ্ঞানার্জন করার পদ্ধতিই ই-লার্নিং নামে পরিচিত। বর্তমানে অনলাইনে ছোট ছোট কোর্স করে সুনিদৃষ্ট বিষয়ে নিজের দক্ষতা বৃদ্ধির এ প্রচেষ্টা গ্লোবালি একটি জনপ্রিয় পন্থা হয়ে উঠছে। পাশাপাশি ইউরোপ আমেরিকার তাবৎ সব বড় বড় কর্পোরেশন নিজেদের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ই-লার্নিং পদ্ধতির দিকে ব্যাপকভাবে ঝুঁকছে।

ই-লার্নিং শব্দটি প্রথম ব্যবহৃত হয় ১৯৯৯ সালে। ই-লার্নিং শব্দবন্ধের সাথে যুক্ত ‘অনলাইন লার্নিং’ কিংবা ‘ভার্চুয়াল লার্নিং’ শব্দদ্বয়ও সমসাময়িক সময়ে ব্যবহার হওয়া শুরু করে। তবে দূরশিক্ষনের যে ধারনা, তা কিন্তু ইন্টারনেট প্রযুক্তি আসার আগেই শুরু হয়েছে। ১৮৪০ সালে বৃটিশ নাগরিক স্যার আইজ্যাক পিটম্যান প্রথম তার শিক্ষার্থীদের জন্য দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের যাত্রা শুরু করেন। তিনি সেসময় শিক্ষার্থীদেরকে শর্টহ্যান্ড রাইটিং শেখানোর জন্য পোষ্টকার্ডে শর্টহ্যান্ড লিখে পাঠিয়ে দিতেন এবং শিক্ষার্থীরা শর্টহ্যান্ডগুলোকে বুঝে নিয়ে সেগুলোর অর্থ উদ্ধার করে ফিরতি খামে লিখে পাঠাতেন। এরপর ১৯২৪ সালে প্রথম ‘টেস্টিং মেশিন’ আবিষ্কৃত হয়, যেটা দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজেরা নিজেদের মূল্যায়ন করতে পারতেন। এরপর ১৯৫৪ সালে হাভার্ডের অধ্যাপক বিএফ স্কিনার ‘টিচিং মেশিন’ আবিষ্কার করেন, যেটার মাধ্যমে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন নির্দেশিকা পূর্বেই তৈরি করে রাখতেন, যা পরবর্তিতে শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করতেন।

 

১৯৬০ সালে পৃথিবীতে প্রথম কম্পিউটার ভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচী যাত্রা শুরু করে। ¯^য়ংক্রিয় শিক্ষা সরবরাহের এ পদ্ধতিকে তখন বলা হতো প্লাটো-প্রোগ্রামড লজিক, যা প্রথমে আমেরিকার ইলিনিয়স বিশ্ববিদ্যালয়ে চালু হলেও পরবর্তিতে পাশ্ববর্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে চালু হয়। ১৯৭০ সালের দিকে এসে প্রযুক্তি ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম আরও মিথষ্ক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। সে সময় ব্রিটেনের ওপেন ইউনিভার্সিটি ইন্টারনেট ব্যবহার করে মেইলের মাধ্যমে অনলাইনে শিক্ষা সরবরাহের সুযোগটির সর্বাধিক ব্যবহার করে।

 

এরপর ১৯৮৪ সালে এ্যাপেলের ম্যাকোনটিশ আসার পর বদলে সবকিছু। টেক্সনির্ভর কম্পিউটার প্রযুক্তি বদলে অনেকটাই গ্রাফিকাল ও ইমেজ নির্ভর হয়ে ওঠে। এর মাউসের ব্যবহার ও বৈশিষ্ট শিক্ষার্থীর মিথষ্ক্রিয়ার ধরনকে আরও সক্রিয় করে তোলে। ১৯৯০ সালে আসে মাল্টিমিডিয়া পিসি, যেটাতে যুক্ত হয় সিডি রম। এসময় মাইক্রোসফট পাওয়ার পয়েন্টর আসলে অনলাইনে শিক্ষা সরবরাহে আসে বৈপ্লিবিক পরিবর্তন। ভিডিও, অডিও, গ্রাফিকস ও এ্যানিমেশন অনলাইন শিক্ষাকে আরও সহজ,আধুনিক, আনন্দদায়ক ও মিথষ্ক্রিয়াশীল করে তোলে। এই সময় আমেরিকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনে কোর্স চালু করে, ভৌগলিক দূরত্বের কারনে যারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পায় না, তাদের মধ্যে এই কোর্সগুলো ব্যপক জনপ্রিয়তা পায়।

১৯৯৯ সালের নভেম্বরে ডিসনিওয়ার্ল্ডে অনুষ্ঠিত টেকলার্ন কনফারেন্সে এলিয়ট ম্যাসাই ‘ই-লার্নিং’ শব্দের প্রথম ব্যবহার করেন। একুশ শতকের প্রথম দশকে আমরা টেক্সট নির্ভন ওয়েব ১.০ থেকে ওয়েব ২.০ তে শিফট করি। এই পরিবর্তণ ই-লার্নিং এর গুনগত পরিবর্তনে যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করে। একুশ শতকের একদম শুরুতে বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান কর্মীদের ইন্ড্রাস্ট্রি নলেজ বাড়ানো ও সুনিদৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক হারে ই-লার্নিং পদ্ধতির দারস্থ হতে শুরু করে।

Print Friendly, PDF & Email

২ টি মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন

সাবস্ক্রাইব করুন

×

ফেসবুকে যুক্ত থাকুন