ই-লার্নিং ও সাংবাদিকতা শিক্ষা

লেখাটি শেয়ার করুন

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার, ইন্টারনেট ভিত্তিক শিক্ষা সরবরাহ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী শিক্ষা ব্যবস্থাকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে। স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে বিজ্ঞান, গবেষণা এমনকি সাংবাদিকতা শিক্ষার ক্ষেত্রেও অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো। নিজের ঘরে বসে, সুবিধামতো সময়ে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিতে অসংখ্য মানুষ ই-লার্নিং এর মাধ্যমে নানা ধরনের কোর্সে অংশ নিচ্ছেন। নিজেদের দক্ষতা, জ্ঞান ও পেশাদারিত্বের জায়গায় উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন।

বিশ্বজুড়ে অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি নিজেদের শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছেন। কিছু প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে যারা সুনির্দিষ্ট ফি-এর বিনিময়ে আগ্রহীদের জন্য অনলাইন কোর্স তৈরি করছেন। যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা শিক্ষার ক্ষেত্রেও এ ধরনের প্রবণতা লক্ষ্য করার মতো।

 দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের একটা বড় অংশের সাংবাদিকতা বিষয়ে কোন একাডেমিক পড়াশুনা নেই। অনেক সাংবাদিকই নিজেদের দক্ষতা ও জানাশোনা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু সাংবাদিকদের এই প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির সুযোগ চাহিদার তুলনায় খুবই কম 

বিশ্বের বড় বড় সংবাদ সংস্থা তাদের সংবাদকর্মীদের পেশাগত দক্ষতা ও সাংবাদিকতাবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধির জন্য ই-লার্নিং টুলকে বেছে নিচ্ছে। উদাহরণস্বরুপ, ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কর্পোরেশন (বিবিসি) বিশ্বব্যাপী তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রতিনিধিদের জন্য www.bbc.co.uk/learning শীর্ষক একটি ই-লার্নিং পরিসর তৈরি করেছে, বিভিন্ন বিষয়ের ওপর রচিত প্রবন্ধ, ভিডিও টিউটোরিয়ালের মাধ্যমে যেখানে বসে বিবিসি’র সংবাদকর্মীরা নানাবিধ বিষয়ে নিজেদের জ্ঞান ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির কাজ করছে।

এছাড়া সাংবাদিকতা ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যেমন: মিডিয়া হেল্পিং মিডিয়া (www.mediahelpingmedia.org), পয়েন্টার নিউজ ইউনিভার্সিটি (www.newsu.org), থমসন ফাউন্ডেশন (thomsonfoundation.edcastcloud.com) সাংবাদিকতার শিক্ষার্থী, নবীশ সাংবাদিক ও যোগাযোগকর্মীদের জন্য ওয়েবভিত্তিক শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনকি পৃথিবীর এক নম্বর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সাইট ফেসবুকও সাংবাদিকদের জন্য ই-লার্নিং কোর্সের (www.facebook.com/business/e/courses/journalists) কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে।

এ ধরনের অনলাইন শিক্ষা পরিসরগুলোতে সাংবাদিকতার বিভিন্ন খুঁটিনাটি বিষয়ে সুনির্দিষ্ট আলাপ-আলোচনা, পরামর্শ, টিপস, ভিডিও টিউটোরিয়াল সরবরাহ করে থাকে, যা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সাংবাদিকদেরকে খুব সহজে, স্বল্পতম সময়ে নিজের ঘরে/অফিসে বসে নতুন নতুন বিষয় সম্পর্কে জানার, শেখার সুযোগ করে দিয়েছে।

বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের নানা উদ্যোগ চোখে পড়ছে। স্কুলে স্কুলে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রোগ্রাম-এর উদ্যোগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকসমূহ ই-বুক-এ রূপান্তর করা হয়েছে।

শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, গবেষক বিনামূল্যে যে কেউ যেকোনো সময় অনলাইনে ই-বুক দেখতে পারছেন। এছাড়া মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে উদ্বোধন করেন দেশের অন্যতম বাংলা ভাষায় নির্মিত উন্মুক্ত ই-লার্নিং প্লাটফর্ম মুক্তপাঠ।  যেখানে বর্তমানে এক লক্ষের অধিক শিক্ষার্থী একুশটির বেশি কোর্সে অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা গ্রহণ করছেন।

প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) দেশ ও দেশের বাইরে কর্মরত সাংবাদিক, গণমাধ্যমকর্মী ও শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারের এটুআই প্রোগ্রামের সঙ্গে যৌথভাবে বাংলা ভাষায় বিশ্বের প্রথম সাংবাদিকতা বিষয়ক ই-লার্নিং প্ল্যাটফর্ম চালু করে ২০১৭ সালের অক্টোবরে। এই ই-লার্নিং প্লাটফর্মের মাধ্যমে সংবাদকর্মী ও সাংবাদিকতার শিক্ষার্থীরা অবসর সময়ে নিজেদের ঘরে বসেই সাংবাদিকতা শিখতে পারছেন।

প্রাথমিকভাবে চারটি কোর্স নিয়ে যাত্রা শুরু করেছে সাংবাদিকতাবিষয়ক দেশের একমাত্র ই-লার্নিং প্লাটফর্মটি। সাংবাদিকতায় বুনিয়াদি কোর্স, টেলিভিশন সাংবাদিকতা কোর্স, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং উন্নয়ন সাংবাদিকতা কোর্স শীর্ষক এ চারটি কোর্স আগ্রহীরা বিনামূল্যে রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে কোর্সে অংশ নিতে পারছেন। এর সাথে বর্তমানে যুক্ত হয়েছে আরও চারটি কোর্স।  কোর্সগুলো হচ্ছে- মোবাইল সাংবদিকতা, প্রেস রিলিজ রাইটিং, অনলাইন গণমাধ্যম ব্যবস্থাপনা ও সাংবাদিকতা এবং টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপনা কোর্স।

 ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখে তথ্য মন্ত্রী জনাব হাছান মাহমুদ জাতীয় প্রেস ক্লাবের মিলনায়তনে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের বার্ষিক সাধারণ সভায় বলেন,  ‘যেখানে ১১ বছর আগে সাড়ে চারশ’ দৈনিক পত্রিকা ছিল, এখন সেটি ১২৫০-এ উন্নীত হয়েছে। ১১ বছর আগে যেখানে টেলিভিশন চ্যানেল ১০টি ছিল, এখন সেটি ৩৪টিতে উন্নীত হয়েছে। ১১ বছর আগে যেখানে  হাতেগোনা কয়েকটি অনলাইন পত্রিকা ছিল, এখন রেজিস্ট্রেশনের জন্য সাড়ে ৩ হাজার অনলাইন পত্রিকা আবেদন করেছে।  আইপিটিভির জন্য প্রায় ৫০০ আবেদন জমা পড়ে আছে।’ নিবন্ধনের বাইরে অনিমিয়ত প্রকাশনা, ব্লগ, ওয়েবসাইটের সংখ্যা তো অজস্র।  এতো এতো গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান পৃথিবীর অন্য কোন দেশে বিরল। কিন্তু এসব গণমাধ্যমের টেকসই বিকাশ কি আদৌ নিশ্চিত? সব গণমাধ্যম কি যোগ্য, দক্ষ সংবাদকর্মী দিয়ে তাদের কাজ পরিচালনা করতে পারছেন?

দেশের গণমাধ্যম কর্মীদের একটা বড় অংশের সাংবাদিকতা বিষয়ে কোন একাডেমিক পড়াশোনা নেই। অনেক সাংবাদিকই নিজেদের দক্ষতা ও জানাশোনা বাড়াতে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। কিন্তু সাংবাদিকদের এ প্রশিক্ষণ প্রাপ্তির সুযোগ চাহিদার তুলনায় খুবই কম। বিশেষ করে মফস্বলে যারা কাজ করেন, তাদের সেই সুযোগ আরও কম। এ রকম জায়গায় দাঁড়িয়ে দেশের সংবাদকর্মীদের মান উন্নয়নে, সাংবাদিকতা শিল্পকে এগিয়ে নিতে সাংবাদিকতা শেখার এ ই-লার্নিং প্লাটফর্ম অভাবনীয় ভূমিকা রাখতে পারে।

পিআইবি’র অনলাইন সাংবাদিকতাবিষয়ক কোর্স চালুর পরে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী বিভিন্ন সময় কোর্সে অংশ নেয়।  দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল তো বটেই, দেশের বাইরে থেকেও অনেক গণমাধ্যমকর্মী ও আগ্রহীরা কোর্সগুলোতে অংশ নিচ্ছেন।  কোর্সগুলোতে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই আছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে সাংবাদিকতা করলেও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণে অংশ নেয়ার সুযোগ পাননি।

পিআইবি মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ সাংবাদিকতায় এসব ই-লার্নিং কোর্স প্রসঙ্গে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ডিজিটাল বাংলাদেশ তৈরিতে ও শিক্ষাকে মানুষের দোড়গোড়ায় পৌছে দিতে আমাদের এ উদ্যোগে এ পর্যন্ত সারা দেশের প্রায় দশ হাজার সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও সাংবাদিকতায় আগ্রহী বিভিন্ন শ্রেনীপেশার মানুষ যুক্ত হয়েছেন। পিআইবি সর্বাত্বকভাবে সারা দেশের গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য সাংবাদিকতা বিষয়ক নানা প্রশিক্ষণ আয়োজন করে আসছে। সেই আয়োজনের অংশ হিসেবেই অনলাইনে প্রশিক্ষণ সেবা সরবরাহ করার আমাদের এই উদ্যোগ। এই উদ্যোগের ফলে কম সময়ে, কম খরচে আমরা যেমন একসাথে অনেক সাংবাদিককে যুক্ত করতে পারছি, তেমনি যারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে থেকে আমাদের গণমাধ্যম শিল্পকে সমৃদ্ধ করে চলছেন, তাদের পেশাগত মান বাড়াতে পারছি বলে আমাদের বিশ্বাস।

আমরাও বিশ্বাস করি বাংলা ভাষায় ই-লার্নিং-এর মাধ্যমে সাংবাদিকতা শেখার পিআইবির এ আয়োজন দেশের সাংবাদিকতা শিক্ষার ইতিহাসে প্রথম।  যত বেশি সংবাদকর্মীকে এ আয়োজনের আওতায় আনা যাবে, ততই দেশের সাংবাদিকতা শিল্পে দক্ষ ও জানাশোনা মানুষের সংখ্যা বাড়বে। সামগ্রিক সাংবাদিকতা চর্চার জায়গায় আরও পরিবর্তন আসবে। এছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান  তাদের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য পিআইবি’র এ ই-লার্নিং প্রশিক্ষণের সুযোগটি কাজে লাগাতে পারেন।

পিআইবি কোর্সগুলোতে অংশ নিতে ভিসিট করুন http://pib.muktopaath.gov.bd/ ওয়েবসাইট।

লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

শেয়ার সংখ্যা
Scroll to Top